বেঙ্গল ডেল্টা কনফারেন্সে বক্তারা

উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে নীতিগত সংস্কার ও কার্যকর কৌশলের তাগিদ

দেশের উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে নীতিগত সংস্কার, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং কার্যকর বাণিজ্যিক কৌশল গ্রহণের তাগিদ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও বেসরকারি খাতসংশ্লিষ্টরা।

তাদের মতে, বাংলাদেশকে এসব ক্ষেত্রে উন্নয়নে কয়েকটি পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা ও সক্ষমতার উন্নয়ন, শিল্প ও শিক্ষার মধ্যে কার্যকর সংযোগ, আঞ্চলিক ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন এবং কর্মদক্ষতাভিত্তিক নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এবং আরো শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে প্রয়োজন কার্যকর বাণিজ্যিক কৌশল। তবেই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি শক্তিশালী অর্থনৈতিক পুনর্গঠন সম্ভব হবে।

রাজধানীতে গতকাল ‘‌বেঙ্গল ডেল্টা কনফারেন্স ২০২৬’ শীর্ষক সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইটিকস (দায়রা) ‘বাংলাদেশ ও পরিবর্তনশীল বিশ্ব: অজানা সময়, উদীয়মান বিশ্বব্যবস্থা এবং সহমর্মিতার রাজনীতি’ প্রতিপাদ্যে এ সম্মেলনের আয়োজন করে। দেশ-বিদেশের নীতিনির্ধারক, গবেষক, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক ও কূটনীতিকরা এতে অংশ নেন।

সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে ‘ইকোনমিক প্ল্যান, রেভিনিউ অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট’ শীর্ষক একটি ফায়ারসাইড আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন সোয়াস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মুশতাক খান। আলোচনায় অংশ নেন অর্থ মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

অধ্যাপক মুশতাক খান কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাকে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং অর্থনৈতিক সংস্কারে গুরুত্ব দেন। এ সময় রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘বর্তমান সরকার একটি নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছে এবং উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও করের হার বৃদ্ধি না করে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে একটি নতুন উন্নয়ন কৌশল বাস্তবায়নে কাজ করছে। আমাদের এখন লক্ষ্য দারিদ্র্য হ্রাস, দক্ষতা ও উদ্ভাবনভিত্তিক শিক্ষা সংস্কার এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালীকরণের মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার করা। এ নিয়ে সরকার বিভিন্ন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।

আলোচনায় মুশতাক খান সুশাসন নিশ্চিত না হলে কর প্রণোদনা ও বিভিন্ন সুবিধা কীভাবে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদনশীলতা অর্জন করবে এমন প্রশ্ন তোলেন। জবাবে ড. তিতুমীর জানান, সরকার কর প্রশাসন ও তদারকি ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছে। বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের মাধ্যমে, বিশেষ করে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজে রাজস্ব আদায়ে ইতিবাচক অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।

এর আগে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অধ্যাপক মুশতাক খান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘সমগ্র বিশ্ব অর্থনীতিই আজ কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশকেও কর্মসংস্থান তৈরি এবং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির মতো সংকটের মোকাবেলা করতে হচ্ছে।’

‘প্রোডাক্টিভিটি, কম্পিটিটিভনেস অ্যান্ড ট্রেড ফর জবস’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, ‘উৎপাদনশীলতা কেবল মূলধন বা দক্ষ শ্রমিকের ওপর নির্ভর করে না বরং প্রতিষ্ঠানের সাংগঠনিক সক্ষমতা উৎপাদনশীলতার অন্যতম প্রধান নির্ধারক। কোনো প্রতিষ্ঠান বা খাতকে প্রণোদনা দেয়া হলে তার সঙ্গে জবাবদিহিতা ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে, অন্যথায় কাঙ্ক্ষিত উৎপাদনশীলতা অর্জন সম্ভব নয়।’ অধিবেশনে মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানের সঞ্চালনায় আলোচনায় আরো অংশ নেন ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, জ্যোতি রহমান এবং আবরার হোসেন সায়েম।

অর্থনীতিবিদ জ্যোতি রহমান বলেন, ‘উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মূল ভিত্তি হলো কার্যকর ব্যবস্থাপনা ও সাংগঠনিক দক্ষতা। বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠান ও মানবসম্পদকে কাজে লাগিয়ে নতুন উদ্যোগ গ্রহণ, পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ বাস্তবায়ন এবং সফল উদ্যোগগুলোকে সম্প্রসারণ করতে হবে।’

বাংলাদেশ অ্যাপারেল ইয়ুথ লিডার্স অ্যালায়েন্সের প্রেসিডেন্ট আবরার হোসেন সায়েম বলেন, ‘এলডিসি উত্তরণের পর নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। এজন্য উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ, ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শক্তিশালী করা এবং প্রযুক্তি ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে শিল্প খাতকে আরো প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে হবে।’

এ সময় সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে ড. তিতুমীর বলেন, ‘সরকার দেশের সব অঞ্চলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে সমতাভিত্তিক আঞ্চলিক উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করছে। এছাড়া অর্থনীতিকে বহুমুখীকরণ, শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং স্বল্প সুদের ঋণ ও পুনঃঅর্থায়ন সুবিধাকে উৎপাদনশীলতা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের বাস্তব ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যমে টেকসই শিল্পায়ন নিশ্চিত করা সম্ভব।’

এদিকে দেশের অর্থনীতির জন্য জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা কমানোর তাগিদ দিয়েছেন ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম। ‘ইমপোর্ট ডিপেনডেন্স, ক্লাইমেট ভালনারেবিলিটি অ্যান্ড জিওপলিটিকস: রিথিংকিং এনার্জি সিকিউরিটি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক অধিবেশনে অংশ নিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ করতে হবে। আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতির পরিবর্তে দেশের নিজস্ব সম্পদ ও সক্ষমতাকে আরো কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে। একই সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানি আহরণ পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলে, তাই দীর্ঘমেয়াদে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং বিকল্প জ্বালানির প্রসার নিশ্চিত করা জরুরি।’

এখানে রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. সাইমুম পারভেজ। তিনি বলেন, ‘২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট জ্বালানির প্রায় ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। বায়ুবিদ্যুৎ, সৌরশক্তি এবং অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎস সম্প্রসারণের পাশাপাশি আঞ্চলিক জ্বালানি বাণিজ্যে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরো শক্তিশালী করা সম্ভব।’

তবে সরকারের পক্ষ থেকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠনে কাজ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ডেল্টা কনফারেন্সের উদ্বোধন করে তিনি বলেন, ‘ক্ষমতাসীন বিএনপি এখন অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং রাজনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠনে কাজ করে যাচ্ছে। দীর্ঘ আলোচনার পর রাজনৈতিক দলগুলো একটি ঐকমত্যে পৌঁছেছে, যাতে সংবিধানে এমন কিছু সংশোধন আনা যায় যা দেশের সামগ্রিক ও দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সহায়ক হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘বর্তমানে আমরা এক সংকটময় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক রূপান্তরকালীন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এর ওপর ইরানের মধ্যকার উত্তেজনা এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মতো বিশ্বজুড়ে চলমান নানা সংঘাত আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য মারাত্মক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বছরের পর বছর ধরে চলা অর্থনৈতিক লুটপাট ও অর্থ পাচারের ভয়াবহ ক্ষতির পর টিকে থাকার জন্যই বাংলাদেশকে এখন চরম অর্থনৈতিক লড়াই চালাতে হচ্ছে। তবে আমরা আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি।’

বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আমাদের সামনে এখন বিশাল বেকারত্ব সংকট, বিনিয়োগের অভাব এবং একটি প্রায় ধসে পড়া ব্যাংকিং ব্যবস্থা। এজন্য বাজেটে শিল্প খাতের বিকাশকে উৎসাহিত করতে সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর হ্রাস করেছে এবং শুল্ক ও করে বিশেষ ছাড় দিয়েছে।’

উদ্বোধনী অধিবেশনের বিশেষ অতিথি মালদ্বীপের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুল্লাহ জিহাদ জানান, বর্তমানে দেশটিতে এক লাখের বেশি বাংলাদেশী অভিবাসী কাজ করছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদেরকে শ্রমবাজারের সুরক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করতে হবে। অর্থনৈতিক নীতিকে কেবল প্রযুক্তিগত হিসাব হিসেবে না দেখে মানুষের কল্যাণে ব্যবহারে আমাদের এগিয়ে আসতে হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবিএম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ‘নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা কেবল আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেই আবির্ভূত হচ্ছে না, বরং উৎপাদন, কর্মসংস্থান, যোগাযোগ এবং স্বয়ং জ্ঞানের ক্ষেত্রেও তৈরি হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের শেখানো, গবেষণা করা, প্রতিষ্ঠান পরিচালনা এবং সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রক্রিয়াকে বদলে দিচ্ছে। বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল নতুন করে সাজানো হচ্ছে, শক্তি ও জ্বালানি ব্যবস্থা চাপের মুখে রয়েছে এবং প্রচলিত পেশাগুলো পরিবর্তিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন শিল্পের জন্ম হচ্ছে। এক্ষেত্রে একাডেমিয়া ও ইন্ডাস্ট্রি—উভয়েরই একে অন্যকে প্রয়োজন। তবে এ সম্পর্ক হতে হবে চিন্তাশীল, নৈতিক ও দীর্ঘমেয়াদি।’

দুই দিনব্যাপী বেঙ্গল ডেল্টা কনফারেন্সে ১৯টি প্যানেল আলোচনা, সাতটি কি-নোট স্পিচ, ছয়টি পেপার প্রেজেন্টেশন, একটি করে গোলটেবিল আলোচনা ও ফায়ারসাইড অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে।

আরও